বিসর্জন



সেদিন হুট করে অমৃতার সাথে রেলষ্টেশনে দেখা অমিতলালের। শেষ দেখার পর অবশ্য অনেক গুলো দিন কেটে গিয়েছে। অমৃতা মিস হতে মিসেস হয়েছে, সিঁথির মাঝে টুকটুকে সিঁদুর উঠেছে, হাতে আর দশ জন মহিলাদের মত স্বামীর মঙ্গল কামনার শাঁখা – অনেক কিছু বদলে গেছে। অমিতলাল এই ষ্টেশনের সহকারী মাষ্টার। কয়েক মাস হল জয়েন করেছে। মধ্যবয়স চলছে। যদিও কাজে এখনও স্থিরতা আসে নি। লোকেবলে ঘরে লক্ষ্মীর আগমন এলে নাকি পুরুষের কাজে মন বসে। সে অর্থে অমিতলালের স্থির না থাকার কারন আছে।

মধ্যদুপুরের সূর্যতখন মাথার উপর লম্বভাবে কিরণ বিলি করছিল। এ সময় এমনিতেই কলকাতা-ঢাকাগামি মৈত্রীর আসা যাওয়া কম।ষ্টেশনমাস্টার সুযোগ পেয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। অমিতলালের এই ভ্যাপসা গরম আর সহ্য হচ্ছিল না। এইমাত্র একটা ট্রেন স্টেশন ক্রস করল।পরেরটা আসতে ঘন্টা দুয়েক বাকি।অমিতলাল এই প্রখর রোদে ছায়ার সন্ধানে বের হন।

অঘটনটা ঘটল এর পর।

স্টেশনের পাশের রাস্তায় কতগুলো কুকুর এক রমনীকে ঘিরে হঠাৎ হৈ হুল্লোড় শুরু করে দিল। অমিতলাল সেই রমনীকে উদ্ধারে এগিয়ে এসে আবিস্কার করেন এ হল অমৃতা।

অমৃতা এত সহজে চিনতে পারেনি যদিও। অবাকদৃষ্টিতে কতক্ষণ তাকিয়েছিল।অমিতের হাসি পেল। এক যুগেও এ দৃষ্টি বদলায় নি।


– আরে!! তুমি?? এ দিকে?
– কলকাতা হতে এলাম। শ্বাশুড়িমা আজসকালে মারা গিয়েছেন। তার শ্রাদ্ধে এলাম।
– ও। কলকাতায় কি থাকছো তাহলে?
– হুম। তাও বছর সাতেক।
– অনেক সময়। বাংলাদেশে আসা হয় না?
-আরও দুবার এলাম। এ স্টেশনদিয়েই। তোমাকে যদিও আগে দেখিনি।
– আমি কদিন আগে এসেছি।
– ও

অমৃতা চুপ হয়ে যায় বলার মত কোন কথা না পেয়ে।অমিত তাকে লক্ষ্য করে। অনেকটা বদলে গেছে অমৃতা। শরীরটা ভারী হয়েছে, গালে মাংস বেড়েছে। মুখে সেই প্রেমিকার স্নিগ্ধতা নেই। তার যায়গা দখল করেছে কোমলতা আর সামান্য কঠোরতার সংমিশ্রন।

-একলাই এলে?
– সাথে কাউকে আসা করছিলে নাকি?
-তোমার হাসব্যান্ড?
-বিয়ে করেছি কে বলল তোমাকে?
– তবে সিঁদুরটা…
মাথায় হাত চলে গেল অমৃতার। হেসে বলল
– আগের চেয়ে বুদ্ধিমান হয়েছ।
অমৃতার মোবাইল বেজে উঠল। কিছুক্ষন কথা বলে লাইন কেটে অমিতের দিকে তাকালো ও
– এদিকে হোটেল আছে?
– হুম। দুপুরে খাও নি?
– না। সকালেও না। তাড়াহুড়োয় বের হলাম তো।
– চল।



হোটেলের নাম বিসমিল্লাহ। হোটেলের সামনে কাজের লোকগুলো পরোটা ভাজছে। অমিত ভেতরের দিকে গিয়ে বসে।

– হাসব্যান্ড কি করে তোমার?
– ডাক্তার।
– ও। ভাল তো। কোথায়?
– ওর মায়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না কদিন ধরে। ও দুদিন আগেই এসেছে দেশে।
– শ্বাশুড়ির সেবা পুত্রবধুঁর করা উচিত।

অমৃতা হালকা হাসল। অমিত খেয়াল করে অমৃতার গালের টোল আগের চেয়ে গাঢ় হয়েছে।
ঠিক কতদিন পর অমৃতাকে দেখছে ও? অমিত মনে করার চেষ্টা করে।মনে পড়ে না তার। অমৃতাকে ঠিক ততদিন আগে দেখেছিল যতদিন গেলে আর মনে থাকে না কতদিন পর দেখা!! শেষবার অবশ্য এই হাসি ছিল না ঠোঁটে। অমিতের শুধু শেষবারের সন্ধাটা মনে আছে। বৃষ্টি ঝরেছে খানিক আগেই। পুকুর পাড়ের পাশে কামিনীর নিচে দাড়িয়েছিল অমৃতা। বৃষ্টির ছাঁটে কাপড় আর মুখ ভিজে গেছে। অমিত কিছুক্ষন থমকে তাকিয়েছিল ওই মুখটার দিকে। অনেক দিনের স্বপ্নে ভাবা মায়াময় মুখটা।

– তোমার আর কিছু বলার নেই?
– না।
চুপ করে থাকে দুজন। অমৃতা ভেজা মুখটা তুলে তাকায়।
– যাই তবে। মা খুঁজবে।

বৃষ্টিতে ঝরে পড়া কামিনীর তীব্র ঘ্রানের চেয়ে তীব্র আকাঙ্খা জাগে অমিতের মনে অমৃতাকে পাবার। সেই আকাঙ্খায় জল ঢেলে অমৃতা ধীরে ধীরে চলে যায়। আকাশ তখন লালচে রূপ ধারন করেছিল। আজ অমিতের মনে হচ্ছে সেই রঙের চেয়ে অমৃতার আজকের সিঁদুরটা বেশি জ্বলজ্বলে।
খাবার এসে গেছে। লুচি আর আলুর দম।

– মা কেমন আছে?
– মারা গিয়েছে। তুমি চলে যাবার এক মাস পরেই।
– ও। মায়ের চিকিৎসা করিয়েছিলে?
– তেমন পারি নি। চাকুরি পাই নি তখনও।

তখন অমিত সদ্য যুবক। চোখে একরাশ স্বপ্নরা খেলা করছে। একটা চাকুরি পেয়ে নেক। অমৃতাকে ঘরে তুলবে। মায়ের তো খুব পছন্দ ওকে। সবকিছু হয়তো গুছিয়ে নিত। হুট করে মায়ের বাজে অসুখ হল। অনেকগুলো টাকা লাগবে। অমিত তখন উদ্ভ্রান্তের মত ঘুরছে। দিন যত যাচ্ছে তত অমৃতা আর মা – দুজনেই আস্তে আস্তে দূরে চলে যাচ্ছে অমিতের কাছ হতে। অমিতের পৃথিবীটার অর্ধেকটা মাকে নিয়ে। একটা জীবন একা সংগ্রাম করে কাটালো মা। অমিত বুঝল তাকেও একজনকে বাছাই করে সংগ্রামটা চালাতে হবে- মা অথবা অমৃতা। অমিত মাকে বেছে নিয়েছিল সেদিন। অমৃতা এ নিয়ে কোন অভিযোগ করে নি। মেনে নিয়েছিল তার বিসর্জন।
আপসোস অমিতের বিসর্জন কোন শুভ আনে নি। মা বাচেঁ নি।

– তোমাদের কোন ছেলেমেয়ে…
– ছেলে হত আমার। নামও রেখেছিলাম। অমিতাভ। কিন্তু বাচঁল না।
– কিভাবে?
– জন্মের সময়। অমিতাভকে বাচাঁনো যেত। যদি শুভজিৎ চাইত। তাহলে আজ তোমার সাথে দেখা হত না আমার।
– শুভজিৎ?
– আমার বর।
-হুম। কলকাতায় গেলে কেন?
-মার সাথে শুভর বনিবানা হচ্ছিল না। মা চাচ্ছিল ওকে আবার বিয়ে দিতে।
– তুমি থাকতে?

– অমিতাভ আসার সময় আমার কিছু সমস্যা ধরা পরে। যার কারনে আমি আর মা হতে পারতাম না। শুভ মার কথা শুনে নি। আমায় নিয়ে কলকাতায় চলে যায়। মাঝেমাঝে এসে মাকে দেখে যেত।

– ভালো একটা বর পেলে তাহলে।
– অবশ্যই।
– তা তোমার বর মশায় আসবে কখন?
– আসবে একটু পর। ফোনদিয়ে বলেছিল। রাস্তায় কি যেন হল।
অমিত চুপ হয়ে ভাবে। অমৃতা কি সুখী? এত ভালো বর থাকতে অমিতকে কি তার আর মনে পড়ে? অমৃতার মুখ দেখে বুঝার লক্ষণ নেই। কৈশোরের অপরিপক্কতা আজ অভিজ্ঞতায় চাপা পড়ে গেছে। এ মুখ দেখে ভালবাসা খোঁজা অমিতলালের পক্ষে আর সম্ভব না। ফোনটা বেজে উঠে অমৃতার। উঠে দাড়ায় ও।

– গেলাম তাহলে। বিয়ে করে নিও। আর কিছু না হোক অন্তত রোজ তোমাকে কাজে যাবার আগে জামাটা ধুয়ে আয়রন করে দিবে।

– একটা কথা ছিল জানার।
– বল।
– যেদিন ফিরিয়ে দিয়েছিলাম বলেছি পরের জন্মে আমার বউ হবে তুমি। তুমি কি আজও এটাই চাও?
অমৃতা খানিকক্ষন চুপ হয়ে যায়। তারপর স্থির গলায় বলে,

– তখন বুঝতাম না স্বামী মানেটা কি। যে আমায় এ জন্মে কারন থাকা স্বত্তেও বিসর্জন দেয় নি তাকে পরের জন্মে বিসর্জন দেই কি করে আমি?

অমৃতা কথাটি বলে ফিরে যায়। ঠিক এক যুগ আগে যেমন চলে গিয়েছিল। অমিতলালের মনে হয় অমৃতা শুধু এ জন্ম না বাকি জন্মের জন্যও তার কাছ হতে দূরে চলে যাচ্ছে!
নবীনতর পূর্বতন